আসল অর্গানিক ফুড চিনবেন কীভাবে? বাজারে ৫টি সহজ প্রাথমিক যাচাই - Pandabari.com

কল করুন: 01799-377-366

Free delivery on all orders over ৳1100

SM461681

আসল অর্গানিক ফুড চিনবেন কীভাবে? বাজারে ৫টি সহজ প্রাথমিক যাচাই

সবজির ঝুড়িটা বেশ সুন্দর। টমেটোগুলো একটু এবড়োখেবড়ো, লাউয়ের গায়ে ছোট দাগ, পাশে হাতে লেখা বোর্ড—“১০০% অর্গানিক, কেমিক্যালমুক্ত”। দামও পাশের দোকানের চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি।

এমন সময় সন্দেহটা মাথায় আসাই স্বাভাবিক—দাম বেশি আর দেখতে একটু ‘গ্রাম্য’ হলেই কি খাবার অর্গানিক হয়ে যায়?

না! আবার চকচকে, সমান আকারের সবজি দেখেই সেটিকে অর্গানিক নয় বলে বাতিল করাও ঠিক নয়।

বাংলাদেশের বাজারে অর্গানিক খাবার কিনতে গিয়ে এই জায়গাতেই ঝামেলা বেশি। “অর্গানিক”, “প্রাকৃতিক”, “বিষমুক্ত”, “নিরাপদ”, “কেমিক্যালমুক্ত”—শব্দগুলো পাশাপাশি ঘোরে, কিন্তু সবগুলোর অর্থ এক নয়। তাই শুধু প্যাকেটের সবুজ রং, পাতার ছবি বা বিক্রেতার আশ্বাসে সিদ্ধান্ত নিলে ঠকে যাওয়ার সুযোগ থাকে।

বাজারে দাঁড়িয়ে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। তবে পাঁচটি প্রাথমিক যাচাই করলে অন্তত বোঝা যায়, অর্গানিক দাবিটির পেছনে বাস্তব প্রমাণ আছে, নাকি শুধু ভালো শোনানো একটি শব্দ আছে।

বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-তে “জৈব-খাদ্য” বা organic food বলতে জৈব উৎপাদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রস্তুত খাদ্যকে বোঝানো হয়েছে। একই আইনে নির্ধারিত অনুমোদন ছাড়া জৈব-খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, সরবরাহ বা বিক্রয়ের ওপর বিধিনিষেধও রয়েছে। অর্থাৎ “অর্গানিক” নিছক সাজসজ্জার শব্দ হওয়ার কথা নয়।

১. “অর্গানিক” লেখা দেখলেন—এবার সনদটা খুঁজুন

প্যাকেটের সামনে বড় অক্ষরে ORGANIC লেখা খুব সহজ। আসল প্রশ্নটা প্যাকেটের পেছনে।

কোন প্রতিষ্ঠান পণ্যটিকে অর্গানিক হিসেবে প্রত্যয়ন করেছে? সনদের নাম আছে? কোনো কোড, নিবন্ধন বা যাচাইযোগ্য পরিচয় আছে? আমদানি করা পণ্য হলে ব্যবহৃত অর্গানিক চিহ্নটি কোন দেশের বা কোন স্বীকৃত ব্যবস্থার?

প্রতিষ্ঠিত অর্গানিক ব্যবস্থায় এই যাচাইয়ের গুরুত্ব অনেক। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে USDA Organic দাবি ব্যবহার করতে উৎপাদক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত মান পূরণ করতে হয় এবং স্বীকৃত প্রত্যয়নকারী প্রতিষ্ঠানের তদারকির মধ্যে থাকতে হয়। প্যাকেটজাত পণ্যে প্রত্যয়নকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ও লেবেলিং ব্যবস্থার অংশ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্গানিক লোগোর ক্ষেত্রেও অনুমোদিত নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার প্রত্যয়ন দরকার। লোগোর পাশে সেই নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের কোড এবং কৃষিজ কাঁচামাল কোথায় উৎপাদিত হয়েছে, সে তথ্য দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।

তাই কোনো প্যাকেটে শুধু—

“Organic Choice”
“100% Natural”
“Chemical Free”

—লেখা থাকলেই সেটিকে প্রত্যয়িত অর্গানিক ধরে নেবেন না।

বিশেষ করে পরিচিত আন্তর্জাতিক সিল দেখলে তার নকশা আসল কি না এবং সম্ভব হলে সনদ নম্বর বা প্রত্যয়নকারী প্রতিষ্ঠানের নাম মিলিয়ে নেওয়া ভালো। লোগো নকল করা যায়; যাচাইযোগ্য পরিচয় নকল করে টিকিয়ে রাখা তুলনামূলক কঠিন।

২. খাবারটা কোথা থেকে এসেছে—এই প্রশ্নের উত্তর আছে তো?

খোলা বাজারের শসা বা বেগুনের গায়ে তো আর সনদের স্টিকার থাকে না। তখন কী করবেন?

একটু কথা বলুন।

“কোন খামারের?”
“কোথায় চাষ হয়েছে?”
“নিজেদের উৎপাদন, নাকি অন্য জায়গা থেকে কেনা?”
“খামারের নাম বা যোগাযোগের তথ্য আছে?”

বিশ্বাসযোগ্য বিক্রেতা মানেই প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ বক্তৃতার মতো বলে দেবেন—এমন নয়। কিন্তু পণ্যের উৎস সম্পর্কে অন্তত একটি পরিষ্কার পথ থাকা উচিত।

ধরা যাক, একটি দোকান বলছে তাদের সবজি মানিকগঞ্জের একটি নির্দিষ্ট খামার থেকে আসে। খামারের নাম দেওয়া আছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ওয়েবসাইটে উৎপাদনপদ্ধতির তথ্য আছে, প্রয়োজনে যোগাযোগও করা যায়। আরেক দোকানের উত্তর, “ভাই, গ্রামের জিনিস। একদম অর্গানিক।”

দুই উত্তরের মধ্যে পার্থক্যটা বোঝা কঠিন নয়।

অর্গানিক প্রত্যয়নের মূল শক্তির একটি হলো ট্রেসযোগ্যতা—পণ্যটি কোথা থেকে এসেছে এবং উৎপাদন ও সরবরাহের ধারায় কারা যুক্ত ছিল, তার নথি রাখা। USDA-র প্রত্যয়ন ব্যবস্থাতেও পরিদর্শন, নথি পরীক্ষা এবং নিয়মিত পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

খোলা পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতা সব নথি দেখতে পারবেন না। সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু বিক্রেতাই যদি উৎসের নাম বলতে না পারেন, তখন “অর্গানিক” দাবির ওপর একটু ব্রেক কষাই ভালো।

৩. প্রক্রিয়াজাত খাবারে সামনের ছবি নয়, উপাদানের তালিকা পড়ুন

অর্গানিক বিস্কিট, অর্গানিক সিরিয়াল, অর্গানিক সস—এখানে হিসাবটা কাঁচা লাউয়ের চেয়ে একটু আলাদা।

একটি পণ্যে কোনো একটি উপাদান অর্গানিক হলেই পুরো পণ্যটি অর্গানিক হয়ে যায় না।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যবস্থাগুলোতে এই পার্থক্য স্পষ্ট। USDA-র নিয়মে “Organic” লেখা পণ্যে সাধারণভাবে অন্তত ৯৫ শতাংশ অর্গানিক উপাদান থাকতে হয়—লবণ ও পানি হিসাবের বাইরে। অন্তত ৭০ শতাংশ অর্গানিক উপাদান থাকলে নির্দিষ্ট শর্তে “made with organic…” ধরনের দাবি করা যায়, কিন্তু সেটি একই শ্রেণির দাবি নয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্গানিক লোগো ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পণ্যটির কৃষিজ উপাদানের কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ অর্গানিক হওয়ার নিয়ম রয়েছে।

বাংলাদেশের কোনো পণ্যে এই বিদেশি শতাংশের নিয়ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য ধরে নেওয়ার কারণ নেই। কিন্তু উদাহরণটি একটি কাজে লাগে—“একটি অর্গানিক উপাদান আছে” এবং “পুরো পণ্য অর্গানিক” একই দাবি নয়।

তাই উপাদানের তালিকা দেখুন।

সামনে যদি লেখা থাকে “অর্গানিক ওটস কুকিজ”, পেছনে গিয়ে দেখুন ওটস ছাড়া আর কী কী আছে এবং অর্গানিক দাবিটি ঠিক কীভাবে লেখা হয়েছে। “প্রাকৃতিক”, “হোমমেড”, “প্রিজারভেটিভমুক্ত” কিংবা “খাঁটি”—এসব বৈশিষ্ট্য ভালো হতে পারে, কিন্তু এগুলো নিজেরাই অর্গানিক প্রত্যয়নের বিকল্প নয়।

প্যাকেটের পাতার ছবি দেখে প্রেমে পড়ার আগে পেছনের ছোট অক্ষরগুলোকে একটু সময় দিন। অনেক রহস্য সেখানেই থাকে।

৪. আকার, দাগ, পোকা বা স্বাদ দিয়ে অর্গানিকের বিচার করবেন না

বাজারে একটি মজার ধারণা চালু আছে—অর্গানিক সবজি নাকি দেখতে খারাপ হবেই।

ছোট হবে।
পোকায় কাটা থাকবে।
একটার সঙ্গে আরেকটার আকার মিলবে না।

এর কোনোটিই নির্ভরযোগ্য সনদ নয়।

একটি সবজি আকারে অসম হতে পারে জাত, আবহাওয়া, পানি, পরিপক্বতা বা চাষের নানা কারণে। পোকায় কাটা হওয়াও অর্গানিক উৎপাদনের নিশ্চিত প্রমাণ নয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষ করা ফসলেও পোকা লাগতে পারে।

উল্টো দিকটাও মনে রাখা দরকার: অর্গানিক কৃষির অর্থ এই নয় যে কোনো ধরনের বালাই ব্যবস্থাপনাই করা হয় না। প্রত্যয়িত ব্যবস্থায় কোন উপকরণ ও পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে, তার নিজস্ব নিয়ম থাকে। USDA-র অর্গানিক মানেও অনুমোদিত উৎপাদনপদ্ধতি ও নির্দিষ্ট অনুমোদিত উপকরণের কথা বলা হয়েছে; “কিছুই ব্যবহার করা হয় না”—এমন সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি।

স্বাদ নিয়েও একই সমস্যা। টমেটো বেশি মিষ্টি লাগল, চালের ঘ্রাণ ভালো হলো—এগুলো পণ্যের গুণমান সম্পর্কে আপনার পছন্দ তৈরি করতে পারে। কিন্তু চাষপদ্ধতি প্রমাণ করে না।

অর্গানিক হওয়া মূলত উৎপাদনপদ্ধতি ও তার যাচাইয়ের বিষয়; চেহারার পরীক্ষা নয়।

এই একটি কথা মনে থাকলে বাজারের বেশ কয়েকটি প্রচলিত ফাঁদ এড়ানো যায়।

৫. দাম বেশি কেন—বিক্রেতাকে একটু ব্যাখ্যা করতে দিন

এক কেজি সাধারণ সবজি ৮০ টাকা, পাশে “অর্গানিক” লেখা একই ধরনের সবজি ১৮০ টাকা।

দ্বিতীয়টি কি নিশ্চয়ই আসল?

দাম কোনো সনদ নয়।

অর্গানিক উৎপাদন, আলাদা ব্যবস্থাপনা, নথি রাখা, প্রত্যয়ন, তুলনামূলক ছোট সরবরাহব্যবস্থা বা পরিবহনের কারণে কোনো পণ্যের দাম বাড়তে পারে। কিন্তু দাম বেশি রাখলেই পণ্যের চাষপদ্ধতি বদলে যায় না।

এই জায়গায় বিক্রেতাকে খুব সাধারণ দু-একটি প্রশ্ন করা যায়—

“দামটা বেশি হওয়ার কারণ কী?”
“আপনাদের কোনো সনদ বা খামারের তথ্য দেখা যাবে?”
“ফসল কীভাবে উৎপাদন করা হয়, সে তথ্য কোথায় পাব?”

ভালো ব্যবসাকে জেরা করার দরকার নেই। স্বাভাবিক ক্রেতার মতো জানতে চাইলেই যথেষ্ট।

উত্তর যদি হয়, “অর্গানিক তো, তাই দাম বেশি”—তাহলে আপনি আসলে নতুন কোনো তথ্য পেলেন না।

আর একটি ব্যাপার খেয়াল করা যায়। যে দোকান বা অনলাইন পেজ অর্গানিক দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবসা করছে, তারা সাধারণত খামার, উৎপাদনপদ্ধতি, প্রত্যয়ন বা সরবরাহের গল্প সম্পর্কে কিছু না কিছু যাচাইযোগ্য তথ্য দেখাতে পারবে। শুধু “বিশ্বাস করুন”—এটি ক্রেতার জন্য দুর্বল প্রমাণ।

“বিষমুক্ত” আর “অর্গানিক”—দুটো কি একই?

এই শব্দদুটো খুব সহজেই গুলিয়ে যায়।

কোনো কৃষক হয়তো নির্দিষ্ট ধরনের রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার করেননি। সেটি জানার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হতে পারে। কিন্তু সেখান থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার পুরো উৎপাদনব্যবস্থাকে প্রত্যয়িত অর্গানিক বলা যায় না।

আবার “প্রাকৃতিক”, “ন্যাচারাল”, “ফার্ম ফ্রেশ”, “গ্রামের”, “নিজস্ব খামারের”—এসব শব্দও পণ্যের উৎস বা বিপণনের ধরন বোঝাতে পারে; অর্গানিক প্রত্যয়নের সমার্থক নয়।

বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য আইনে জৈব-খাদ্যকে নির্দিষ্ট জৈব উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

তাই দোকানের সাইনবোর্ডে দশটি সুন্দর শব্দের চেয়ে একটি যাচাইযোগ্য তথ্যের দাম বেশি।

অর্গানিক সনদ না থাকলে কি খাবারটি খারাপ?

এখানেও একটু ন্যায্য থাকা দরকার।

একজন ছোট কৃষক পরিবেশবান্ধব বা জৈবঘেঁষা পদ্ধতিতে চাষ করতে পারেন, অথচ আনুষ্ঠানিক প্রত্যয়ন তার নাগালের বাইরে থাকতে পারে। শুধু সনদ নেই বলে সেই খাবার খারাপ—এমন সিদ্ধান্তের ভিত্তি নেই।

সমস্যাটা অন্য জায়গায়।

সনদ বা যথেষ্ট যাচাইযোগ্য প্রমাণ ছাড়া ক্রেতা নিশ্চিতভাবে জানেন না যে “অর্গানিক” দাবিটি কোন মানদণ্ডে করা হচ্ছে।

অর্থাৎ খাবারটি ভালো না খারাপ, সেটি এক প্রশ্ন। “প্রত্যয়িত অর্গানিক কি না”—সেটি আরেক প্রশ্ন।

এই দুই প্রশ্ন আলাদা রাখতে পারলে কেনাকাটার সিদ্ধান্ত অনেক পরিষ্কার হয়।

বাজারের ব্যাগ হাতে নেওয়ার আগে যে অভ্যাসটা কাজে দেবে

একদিন বাজার করতে গিয়ে পাশের ক্রেতাকে হয়তো দেখা যাবে টমেটো উল্টেপাল্টে দাগ খুঁজছেন। “দাগ আছে, নিশ্চয়ই অর্গানিক”—বলেই ব্যাগে তুললেন।

তাঁকে থামিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার দরকার নেই।

নিজের কেনাকাটায় বরং অন্য অভ্যাসটি রাখা যায়: দাবির চেয়ে প্রমাণ দেখুন।

সনদ থাকলে কে দিয়েছে দেখুন। পণ্যের উৎস খুঁজুন। প্রক্রিয়াজাত খাবারের উপাদানের তালিকা পড়ুন। চেহারা দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না। আর বেশি দাম চাইলে কেন বেশি—সেটা জানতে সংকোচ করবেন না।

পাণ্ডাবাড়ির মতো খাবারকেন্দ্রিক একটি জায়গায় “অর্গানিক” শব্দটি নিয়ে কথা বলার উদ্দেশ্যও হওয়া উচিত এইটুকুই—কোনো খাবারকে অকারণে ভালো বা খারাপ ঘোষণা করা নয়; ক্রেতাকে এমন কিছু প্রশ্ন দেওয়া, যেগুলো তিনি সত্যিই বাজারে ব্যবহার করতে পারেন।

সবুজ রঙের প্যাকেট চোখে পড়বে। “১০০% ন্যাচারাল” লেখাও থাকবে। কিন্তু ব্যাগে তোলার আগে দশ সেকেন্ডের সেই ছোট্ট প্রশ্নটা রাখুন—

এর প্রমাণটা কোথায়?